মুরগির বাচ্চার ব্রুডিং ব্যবস্থাপনা

মুরগির বাচ্চার ব্রুডিং ব্যবস্থাপনা / Brooding management of poultry chicks

ব্রুডিং ব্যবস্থাপনা বলতে বাচ্চা মুরগির ব্যবস্থাপনাকে (Chick management)  বুঝায় । বাচ্চা মুরগির নিবিড় যত্ন বিশেষ করে ব্রয়লার চিকস্ (Broiler chicks) জন্মের পর থেকে   ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত ও লেয়ার চিকস্ (Layer chicks)
৬-৮ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত নেওয়া হয়ে থাকে। এ সময়কে বাচ্চা মুরগির ব্রুডিং প্রিয়োড (Brooding period ) বলা হয়। ব্রুডিং কালীন সময়ে ব্যবস্থাপনা ফলপ্রসূ হলে বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধি ও উৎপাদন ভালো হয়। লেয়ার চিকস্ (Layer chicks) এর সবচেয়ে উপযুক্ত ব্রুডিং প্রিয়োড হলো জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বিশেষ করে যারা কম সংখ্যক লেয়ার মুরগি পালন করে। এ সময়ে ব্রুডিংকৃত মুরগি যখন সর্বোচ্চ উৎপানে পৌছায় তখন প্রায় শীতকাল চলে আসে । শীতকালে সাধারণত মুরগির ডিমের বাজারদর অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি থাকে ও খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হয়। তবে এ নিয়ম বিশেষ করে যারা সারা বছর জুড়েই মুরগি পালন করেন ( ব্রয়লার বা লেয়ার) তাদের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

ব্রুডিং এর গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাকারী অন্যতম উপাদান (Important components of Brooding) : —

গঠনতান্ত্রিক নিয়মে ফলপ্রসূভাবে  বাচ্চার  ব্রুডিং করতে হলে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সমূহের প্রতি যথাযথ ও সক্রিয়ভাবে গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। যথা—

১। ফ্লোর স্পেস (Floor spaces in brooding time) : —

বাচ্চার ব্রুডিং চলাকালীন সময়ে বাচ্চাকে বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত জায়গা (Adequate brooding space) বরাদ্দ দিতে হবে। এ সময়ে গাদাগাদি (Overcrowding)  করে বাচ্চা মুরগি পালন করলে  মুরগির দৈহিক বৃদ্ধি স্তব্ধ বা থেমে (Stunted growth)  যাবে ও বাচ্চা স্তূপাকারে (Piling of chicks)  জড়ো হবে।  । শুরুতে প্রতিটি বাচ্চার জন্য ৫৫-৬৬ বর্গ সে.মি ব্রুডিং স্পেস বরাদ্দ দিতে হবে এবং বাচ্চার বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্রুডার স্পেস ধীরে ধীরে বাড়াতে (Gradualy increasing brooder space)  হবে। ১.৮ মিটার ব্যাস (Diameter) বিশিষ্ট হোভারের নীচে ৫০০ টি বাচ্চা একত্রে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে তীব্র শীতে ২০০-৩০০ টি বাচ্চা একত্রে ব্রুডিং করলে বাচ্চার ঠান্ডাজনিত মৃত্যুর হার কমবে।

২। ব্রুডিং তাপমাত্রা (Brooding temperature) : —

ব্রুডিং শেডে সঠিক তাপমাত্রা প্রদান করা ফলপ্রসূ ব্রুডিং এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাচ্চা মুরগির ব্রুডিং তাপমাত্রা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। কারণ পরিবেশের তাপমাত্রা এলাকা ও সময়ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। পরিবেশের তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করে বাচ্চা মুরগির জন্য বয়স অনুযায়ী গড় তাপমাত্রার একটি নির্দেশনা (Guideline) অনুসরণ করা হয়ে থাকে ; যা বাচ্চা জন্মের প্রথম সপ্তাহে ৯৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা । পরবর্তীতে তা’ প্রতি সপ্তাহ শেষে ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট করে তাপমাত্রা  কমিয়ে রুম  তাপমাত্রায় (Room temperature) পৌঁছাতে হবে। রুম তাপমাত্রা বলতে ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রাকে বোঝানো হয়েছে। রুম তাপমাত্রায় মুরগি আরামদায়ক পরিবেশ অনুভব করে ‍ও মুরগি সবচেয়ে বেশি সুস্থ থাকে। সাধারণত এ তাপমাত্রা হতে হবে লিটার থেকে ৬ সে.মি. উপরে এবং ৬-৮ সে.মি. হোভারের শেষ প্রান্তে ও চিকগার্ডের ভেতরে। নিম্নে ব্রুডিং তাপমাত্রার একটি নমুনা দেওয়া হলো –

বাচ্চার বয়স ডিগ্রী ফারেনহাইট ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড
০১-০৭ দিন ৯০ ৩২.২
০৮-১৪ দিন ৮৫ ২৯.৪
১৫-২১ দিন ৮০ ২৬.৬
২২-২৮ দিন ৭৫ ২৩.৯
৪৩-৪৯ দিন ৬৫

উল্লেখ্য যে, ৪২ দিনের পরে  খামারে পালনকৃত মুরগি ৬৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রা থেকে ৭০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রায় (Room temperature)  সবচেয়ে বেশি আরামদায়ক পরিবেশ অনুভব করে ও মুরগি সুস্থ থাকার পাশাপাশি কাংখিত উৎপাদন দিতে সক্ষম হয়।

  • ব্রুডারের তাপমাত্রা সঠিক থাকলে সকল বাচ্চা সমানভাবে যে যার মতো করে স্বাধীনভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে,ঘোরাফেরা করবে, বিশ্রাম নিবে,খাদ্য ও পানি গ্রহণ করবে,প্রয়োজনে হোভারের নীচে যাবে, প্রয়োজনে যাবে না।
  • ব্রুডারের তাপমাত্রা কম থাকলে সব বাচ্চা হোভারের নীচে স্তূপাকারে জমা হবে ও তাপের জন্য একটি বাচ্চা আর একটি বাচ্চার উপরে উঠার চেষ্টা করবে।
  • ব্রুডরের তাপমাত্রা বেশি হলে বাচ্চা হোভার থেকে দূরে সরে যাবে ও চিকগার্ডের কাছে জড়ো হবে। বাচ্চা হা করে শ্বাস-প্রশ্বাস নেবে ও হাঁপাত থাকবে।
  • হোভারে সেটিং করা কোন বাল্ব ঠিক মতো কাজ না করলে বা বাল্ব ফিউজ হলে কিংবা বাল্বের ওয়াটের তারতম্য হলে হোভারের নীচে তাপমাত্রা কোথাও কম বা কোথাও বেশি হবে। সেক্ষেত্রে বাচ্চা সঠিক তাপমাত্রা থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে বাচ্চা যেখানে সেখানে স্তূপাকারে জড়ো হবে।

এ অবস্থা থেকে কাটিয়ে উঠতে হলে ব্রুডারে অবস্থানরত বাচ্চার চালচলন বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশের তাপমাত্রা বুঝে ব্রুডারের তাপমাত্রা ঠিক করতে হবে। ব্রুডারের তাপমাত্রা বেশি হলে হোভার পরিবেশ বুঝে  প্রয়োজনে উপরে তুলে রাখতে হবে,তাপমাত্রা কম হলে হোভার প্রয়োজনে নীচে নামাতে হবে। তবে লিটার থেকে অবশ্যই কমপক্ষে একফুট উপরে রেখে হোভার ঝুলাতে হবে। যাতে বাচ্চা বাল্ব কোনভাবেই স্পর্শ করতে না পারে। বাচ্চা বাল্ব স্পর্শ করলে বাল্ব ফিউজ হতে পারে। হোভারের সকল বাল্ব একই ওয়াটের হতে হবে। তা’ না হলে ব্রুডারের তাপমাত্রা অসামঞ্জস্য হবে।

ব্রুডার শেডে এলোমেলোভাবে কিংবা উপরে –নীচে করে বাল্ব সাজানো যাবে না। ব্রুডারে তাপমাত্রার জন্য হোভারের বাল্ব যথেষ্ঠ। তবে তাপমাত্রা উঠানোর জন্য বাড়তি বাল্ব সেট করলে তাতে ক্যাপ লাগাতে হবে। নচেৎ তাপ ও আলো উভয়েই উপরে চলে যাবে। ব্রুডার শেডকে আলোকিত করতে হলে মেঝে থেকে ৭ ফুট উপরে বাল্ব ঝুলিয়ে দিতে হবে। তাতে ব্রুডার শেডের সর্বত্রই সমানভাবে আলো ছড়িয়ে যাবে ও বাচ্চা সঠিকভাবে সবকিছুই বিশেষ করে খাদ্য ও পানির পাত্র ভালোভাবে এবং সহজে দেখতে পাবে।

৩। বায়ু প্রবাহ (Ventilation in Brooder house) : —

ব্রুডার শেডে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা অবশ্যই রাখতে হবে। মুক্ত বায়ু প্রবাহের ব্যবস্থ না রাখলে শেডে বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি হবে। শেড আবদ্ধ রাখলে আর্দ্রতা বেড়ে যাবে ও লিটার দ্রুত নষ্ট হবে। ব্রুডার শেডে এমোনিয়েশন হবে ও বাচ্চায় এমোনিয়া বার্ণ হবে। এছাড়াও শেডে অতিরিক্ত এমোনিয়া গ্যাস হলে শ্বাসতন্ত্রীয় রোগের প্রাদূর্ভাব বেড়ে যাবে ও বাচ্চার চোখ জ্বালা পোড়া করবে।

৪। লিটার বা বিছানা ব্যবস্থাপনা (Litter management in Brooder shed) : —

প্রথমেই ৪-৫ সে.মি. পুরুত্ব করে বাচ্চা মুরগির লিটার বা বিছানা তৈরী করে দিতে হবে। লিটারের উপকরণ তুষ হলে উত্তম হয়। লিটার অবশ্যই সাম্প্রতিককালে শুকানো ও  ঝরঝরে শুকনো হতে হবে। তবে লিটারে বেশি ধূলিকণা থাকা চলবে না। আবার ছত্রাকযুক্ত স্যাতস্যাতে লিটারও ব্যবহার করা যাবে না। ছত্রাকযুক্ত লিটিার ব্যবহার করলে বাচ্চা ব্রুডার নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হতে পারে। মাঝে মধ্যে লিটারের আর্দ্রতা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

লিটার পরীক্ষা করার নিয়ম হলো , এক মুঠো লিটার হাতের মুঠোয় নিয়ে মুঠ  শক্ত করে চেপে ধরে কিছুক্ষণ পরে মুঠ ছেড়ে দিলে লিটার দলা ভেঙ্গে গেলে বুঝতে হবে লিটারের আর্দ্রতা সঠিক আছে আর ভেঙ্গে না গেলে বুঝতে হবে লিটারের আর্দ্রতা বেশি আছ্ । লিটারের আর্দ্রতা বেশি থাকলেই এমোনিয়া গ্যাসের আধিক্য বেড়ে যাবে।

৫। চিকগার্ড (Chick Guard) : —

চিকগার্ডকে অবশ্য  ব্রুডার গার্ডও বলা হয়ে থাকে। ব্রুডার শেডে  চিকগার্ড ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো তাপমাত্রার উৎস থেকে যাতে বাচ্চা দূরে চলে যেতে না পারে। এ চিকগার্ড হতে পারে হার্ড বোর্ডের অথবা স্টিলের তৈরী। চিকগার্ডের উচ্চতা হবে ৪৫ সে.মি.ও তা সটে করতে হবে গোলাকৃতিভাবে। চিকগার্ডের দূরত্ব হবে হোভারের শেষ প্রান্ত থেকে ৮৫-৯০ সে.মি.। বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে চিকগার্ডের পরিধি বৃদ্ধি করতে হবে। ৭-৮ দিন পরে ক্রমান্বয়ে ১৩০ সে.মি. পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে হবে।

৬। খাদ্য ও পানি সরবরাহ (Feeding and watering) : —

বাচ্চা প্রথমেই ব্রুডারে উঠানোর পরপরই কোন রকম খাদ্য সরবরাহ দেওয়া যাবে না। প্রথমেই বাচ্চাকে খাদ্য সরবরাহ দিলে বাচ্চা অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে ক্রোপ (Crop) খাদ্য দ্বারা পরিপূর্ণ হবে। ফলে বাচ্চা প্যান্ডুলাস ক্রোপে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতে পারে।

 জার্নিকৃত বাচ্চা ডিহাইড্রেড থাকায় পিপাসীত থাকে । তাই বাচ্চ ব্রুডারে ছেড়ে দেওয়ার পর বাচ্চাকে প্রথম ৩-৬ ঘন্টা পর্যাপ্তমাত্রায় বিশুদ্ধ পানির সাথে  ইলেক্ট্রোলাইট, ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই পানির সাথে সরবরাহ দিতে হবে। যাতে বাচ্চা জার্নিজনিত ধকল থেকে কেটে উঠতে পারে। পর্যাপ্তমাত্রায় বিশুদ্ধ পানি গ্রহণের পরে বাচ্চাকে ম্যাশ ফিড সরবরাহ দিতে হবে। বাচ্চাকে প্রথম কয়েকদিন সাদা কাগজের উপর খাদ্য ছিটিয়ে দিতে হবে ও এর পাশাপাশি খাদ্য ছোট খাদ্যের পাত্রেও সরবরাহ দিতে হবে। ছোট খাদ্যের পাত্রে খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস গড়ে উঠলে পরে কাগজ সরিয়ে ফেলতে হবে। খাদ্য ও পানির পাত্র হোভারের খুব কাছাকাছি  ও আলেকিত স্থানে দিতে হবে যাতে বাচ্চা মুরগি হোভারের কাছাকাছি থেকে সহজে খাদ্য ও পানি গ্রহণ করতে পারে।

পরিশেষে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাচ্চা ব্রুডারে ছেড়ে দেওয়ার পরে প্রথম এক সপ্তাহ বাচ্চা নিবিড় নজরদারীতে রাখতে একজন কর্মচারিকে শেডে সার্বক্ষণিক থাকতে হবে। ব্রুডার ঠিকমতো কাজ করছে কি না, বাচ্চা ঠিকমতো খাচ্ছে কি না, পানির পাত্রে ঠিকমতো পানি রয়েছে কি না ,ব্রুডার শেডের আলো ঠিকমতো আছে কি না,ব্রুডারের সকল বাল্ব ঠিকমতো কাজ করছে কি না ইত্যাদি ভালোভাবে তদারকি করতে হবে। এছাড়াও ব্রুডারে ব্যবহৃত কাগজ সময় মতো বদলানো হচ্ছে কি না , থার্মোমিটার ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা’ ভালো করে নজরে রাখতে হবে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। যে সমস্ত চিকবক্সে হ্যাচারী বাচ্চা সরবরাহ দেওয়া হবে সে সমস্ত চিকবক্স বাচ্চা ব্রুডারে ছেড়ে দেওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে পুড়ে ফেলতে হবে। তা’ না হলে এ সমস্ত চিকবক্স থেকে রোগ জীবাণু ছড়াতে পারে।