কোয়েল পাখির ডিম ও মাংসের উপকারীতা

কোয়েলের ডিম ও মাংস মানব দেহের জন্য উপকারী/ Benefits of quail eggs and meat for human health —

কোয়েল পাখির ডিম ও মাংস উভয় মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বা চিকিৎসার অংশ হিসেবে রোগের ধরণ অনুযায়ী বা শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে কোয়েলের ডিম ও মাংস উভয় অনুমোদন করা হয় ।বলা যায়, কোয়েল পাখির ডিম ও মাংস উভয় সনেদহাতীতভাবে খুবই পুষ্টিকর এবং মানব দেহে নানা ধরনের রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে ।

কোয়েলের ডিম /Quail Eggs —-

কোয়েল পাখির ডিমে পরিমাণে খুবই যৎসামান্য ক্যালরি বিদ্যমান ।কোয়েল পাখির ডিম অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টিতে পরিপূর্ণ ।
কোয়েলের ডিমে —
ভিটামিন এ ( Vitamin A / Ratinol )
ভিটামিন বি১২
ভিটামিন বি৬
ভিটামিন বি১
ভিটামিন সি
ভিটামিন ডি
ভিটামিন ই
এছাড়াও গবেষণায় নিশ্চিত হয়েছে যে, কোয়েল পাখির ডিমে এন্টিঅক্সিডেন্ট আছে এবং ডিমে ওমেগা- ৩ , ওমেগা – ৬ ফ্যাটি এসিড,সেলিনিয়াম ও কোলিন আছে ।
আরো আছে,
ম্যাগনেশিয়াম
পটাশিয়াম
ফলিক এসিড
আয়রন
ফসফরাস ও
জিঙ্ক (Zinc ) ।

কোয়েল পাখির ডিমে মুরগির ডিমের চেয়ে ৫ গুণ বেশি আয়রন ও পটাশিয়াম রয়েছে ।

নিম্নে ৯ গ্রাম একটি কোয়েল ডিমের পুষ্টি মান উল্লেখ করা হলো —
ক্যালরি—– ১৪ kcal
ফ্যাট ——- ১ গ্রাম
ক্লোস্টেরল — ৭৬ মি. গ্রা .
সোডিয়াম – -১৩ মি.গ্রা .
পটাশিয়াম – ১২ মি.গ্রা .
প্রোটিন —- ১. ২ গ্রাম
ভিটামিন এ — ৭১৭.০৸গ্রা .
ভিটামিন ডি – ১% DV
ভিটামিন বি১২ – ১% DV
আয়রন – ——১% ।

মানব দেহে কোয়েল পাখির ডিমের উপকারীতা নিম্নরূপ —

১। ব্রিইনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে/ Promotes Brain function–

কোয়েল পাখির ডিমে এমাইনো এসিড ও প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি ;যা ব্রিইনের টিস্যুকে (Brain tissue) কার্যকরী করে ও ব্রেইন টিস্যুর পুষ্টি যোগায়।এমাইনো এসিড ও প্রোটিন ব্রিইনের কোষকে (Cells) ধ্বংস থেকে রক্ষা করে ও ধ্বংসপ্রাপ্ত কোষকে পুনর্গঠন করে ।

২। রক্ত স্বল্পতা রোধ করে ( Prevent Anaemia ) : –

মহিলাদের ক্ষেত্রে এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, যাঁরা কোয়েল পাখির ডিম নিয়মিত গ্রহণ করে তাদের রক্ত স্বল্পতা (Anaemia ) রোগের ঝুঁকি কমে যায় ।কোয়েল পাখির ডিমে আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকায় রক্তের লোহিত কণিকা বা আর. বি. সি .( Red blood cells) বেশি তৈরি হয় ফলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের ( Haemoglobin) পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

৩। রক্ত পরিশোধিত করে ( (Purify the Blood ) : —

কোয়েল পাখির ডিম মানব দেহের কতিপয় মেটাবলিক বস্তু ( Metallic elements) ও টক্সিক পদার্থ ( (Toxic substances) বিশেষ করে মার্কারি ( Mercury দেহ থেকে অপসারণ করতে সহায়তা করে ।এমাইনো এসিড ও ডিমের কতিপয় মিলে মানব দেহের টক্সিক পদার্থকে বাইন্ড (Bind) করে এবং দেহ থেকে অপসারণ (Flush) করে দেয় ।এক কথায় বলা যায়, কোয়েল পাখির ডিম মানব দেহের রক্ত বিশুদ্ধ রাখতে সহায়তা করে ।

৪। দেহ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ( Enhance body development ) —

কোয়েল পাখির ডিমে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন থাকায় শিশুদের দেহ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সহায়তা করে ।উল্লেখ্য যে, শিশুদের দেহ গঠনে প্রোটিনের ভূমিকা অপরিসীম ।

৫। ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে ( Boost immune system ) —

কোয়েল পাখির ডিমে পর্যাপ্ত পরিমাণে এমাইনো এসিড রয়েছে ।বিশেষ করে লাইসিন ( Lysine) ।লাইসিন রোগ মানব দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে আরো শক্তি যোগায় ।লাইসিন এন্টিবডি উৎপাদন করতে সাহায্য করে এবং ইমিউন ফাংশন বৃদ্ধিকে সাপোর্ট করে ।

৬। ডায়াবেটিস রোগ প্রতিরোধ করে ( Prevent Diabetes) —

কোয়েল ডিমে বিদ্যমান এমাইনো এসিড বিশেষ করে লিউসিন ( Leusine) রক্তে সুগার লেভেলকে নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে এবং রক্তে ইনসুলিন লেভেল (lnsulin Level) এর ভারসাম্য রক্ষা করে ।তাই কোয়েল পাখির ডিম ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য চিকিৎসার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে ।

৭। স্কিনকে সুস্থ রাখে ( Maintain healthy skin) —

কোয়েল ডিম প্রোটিনের একটি উৎকৃষ্টমানের উৎস ।এতে যে লাইসিন রয়েছে তা’ দেহে কোলাজেন ( Collagen) উৎপাদনে সহায়তা করে ।কোলাজেন এমন এক ধরণের প্রোটিন যা দেহের স্কিন সুস্থ ও টানটান রাখতে সহায়তা করে ।

৮। মেটাবলিজমে সহায়তা করে ( Maintain healthy metabolism) —

কোয়েল পাখির ডিমে অনেক ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে ।বিশেষ করে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (Vitamin B complex) যা স্বাভাবিক মেটাবলিজমকে সঠিক রাখে ।ভিটামিন বি কমপ্লেক্স এর মধ্যে ভিটামিন বি১২ ও বি৬ মেটাবলিক এনজাইমের ভূমিকা পালন করে ।

৯। মাংসপেশীর গঠনে কাজ করে ( Build mussels) –

কোয়েল পাখির ডিমে উচ্চ মানের প্রোটিন থাকায় মাংসপেশীর গঠনে কাজ করে ।মাংসপেশীর গঠন সঠিক রাখতে প্রতিদিন কোয়েল পাখির ডিম গ্রহণ করা দরকার ।

১০। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ( Reduce the risks of Heart disease) —

কোয়েল ডিমে অনেক ধরনের পুষ্টি উপাদান ভিটামিন-ই (Vitamin E ) / টোকোফেরল ( Tocoferol ) রয়েছে ।যা ২৪% হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে (Study by Loe et al in 2013 )।

১১। দৃষ্টিশক্তি উন্নয়নে ( Improve Vision ) —

কোয়েল পাখির ডিমে কিছু পরিমাণ ভিটামিন এ ( Vitamin A ) রয়েছে ।যা চোখের সুস্থতা রক্ষায় মূখ্য ভূমিকা পালন করে ।

১২। চুল সুস্থ রাখে ( Promotes healthy hairs) —

চুলের গঠন সঠিক রাখতে কোয়েল পাখির ডিম ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে ।কোয়েল ডিমে এমাইনো এসিড বিশেষ করে লিনোলিট এসিড ( Linoleat acid ) যা চুলের গোড়াকে মজবুত রাখে এবং চুলের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে ।

১৩। হাড়কে মজবুত রাখতে ( Promotes bone development) –

কোয়েল পাখির ডিমে এমাইনো এসিড বিশেষ করে লাইসিন ( Lysine ) শিশুদের দেহের হাড়/ অস্থি (Bone ) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

১৪। নিম্ন রক্তচাপ থেকে রক্ষা করে (Prevent Lower blood pressure ) —

কোয়েল ডিমে শুধুমাত্র উচ্চমানের এমাইনো এসিডই থাকে না কোয়েল ডিমে ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধও বটে ।বিশেষ করে ডেকোসাহেক্সাএনোইক এসিড ( Decosahexaenoic acid or DHA ) । DHA এক ধরনের ফ্যাটি এসিড যা রক্তের চাপকে ( Blood pressure ) স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে এবং হৃদরোগের (Cardiovascular disease ) ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে ।

১৫। ক্লোস্টেরল কমাতে ( Reduce Cholesterol ) —

মানব দেহে দু’ ধরনের ক্লোস্টেরল রয়েছে । যথা – LDL ও HDL।LDL অর্থ Low density Lipoprotein ও HDL অর্থ High density Lipoprotein । LDL হল খারাপ (bad ) ক্লোস্টেরল আর HDL হল ভালো ক্লোস্টেরল ।২০০২ সালে Dietary Guidance of America নামক সমীক্ষায় দেখা গেছে কোয়েল পাখির ডিমে Trans Fatty acid যা একটি ভালো খাদ্য হিসেবে পরিচিত অন্যান্য যে কোন পাখির ডিম থেকে ।কোয়েলের ডিমের ফ্যাটি এসিড রক্তের LDL কমাতে সাহায্য করে ।

১৬। দাঁতের যত্নে ( Maintain healthy Teeth ) —

কোয়েল পাখির ডিমের কুসুমে ( Yolk ) অবস্থিত মিনারেল বিশেষ করে জিঙ্ক ( Zinc ) দাঁতকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ।

১৭। বিষাদগ্রস্ততা হ্রাস ( Reduce depression ) —

কোয়েল পাখির ডিম শুধুমাত্র ভিটামিন,মিনারেল,কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন সমৃদ্ধই নয় ।এতে কতিপয় সেক্স হরমোন রয়েছে ।যা Daniel in 2010 এর স্ট্যাডি থেকে জানা যায় ।কোয়েল ডিমে Anti-depression উপাদান রয়েছে যাকে Hormone-p বলে ।যা মহিলাদেরকে depression থেকে রক্ষা করে ।বিশেষ করে যারা Menopause syndrome এ ভোগে ।

১৮। এলার্জি চিকিৎসায় ( Treat Allergy ) —

যে কোন পাখির ডিমে এলার্জিক উপাদান রয়েছে ।যা সবার কাছে জানা কথা ।তবে কোয়েল পাখির ডিম সম্পূর্ণরূপে এলার্জি মুক্ত ।কোয়েল পাখির ডিমে Ovomucoid protein থাকায় এতে কোন রকম Allergic reactions নেই ।তাই কোয়েল পাখির ডিম anti-allergic drug হিসেবে ব্যবহৃত হয় ।

১৯। দ্রুত আরোগ্য লাভে সাহায্য করে ( Help to recover faster) —

কোয়েল ডিমে উচ্চ মাত্রায় প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকায় কোয়েল পাখির ডিম একজন অসুস্থ মানুষকে সহজে ও দ্রুত আরোগ্য করে তুলতে সাহায্য করে ।ধ্বংসপ্রাপ্ত কোষকে (Damaged cells) পুনর্গঠন ও নতুন কোষ তৈরিতে কাজ করে ।

২০। এজমা ও যক্ষ্মা রোগ উপশমে কাজ করে (Releives Asthma and Tuberculosis ) —

কোয়েল ডিমে যে উপাদান রয়েছে তা Asthma ও Tuberculosis রোগের চিকিৎসায় উপকারী ।

২১। গ্যাসট্রাইটিস রোগের চিকিৎসায় ( Treat gastritis) —

কোয়েল পাখির ডিমে anti-inflammatory উপাদান রয়েছে যা পাকস্থলীর ক্ষত (Stomach ulcers) ও gastritis চিকিৎসায় সাহায্য করে ।কোয়েল ডিমের এমাইনো এসিড পাকস্থলীর ক্ষত পুনর্গঠনে সাহায্য করে ।

কোয়েল পাখির ডিম ভক্ষণে শারীরিক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সংক্রান্ত টিপস ( Health side effects and Tips of consume Quail eggs) —

কোয়েল ডিম ভক্ষণে কোন শারীরিক পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই ।এমন কি কোন ধরণের এলার্জি ও নেই ।তবে একজন ব্যক্তির দিনে ২০ টির বেশি ডিম ভক্ষণ করা উচিত নয় ।

কোয়েল পাখির ডিম সম্পর্কে যা জানা দরকার তা’নিম্নে তুলে ধরা হলো —
ক) বাজার থেকে সর্বদা মান সম্মত ডিম ক্রয় করা দরকার ।
খ) দিনে সর্বোচ্চ ৫ টি ডিম ভক্ষণ করা যাবে ।তবে ভিটামিন এ (Vitamin A ) সমৃদ্ধ খাবার সমূহ এড়িয়ে চলতে হবে ।
গ) কোয়েলের ডিম ভালো করে পরিষ্কার করে কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যাবে ।কোয়েল ডিমে লাইসোজাইম এনজাইম (Lysozyme enzyme) রয়েছে যা ব্যাকটেরিয়া কিলার (Bacteria killer) হিসেবে
পরিচিত ।
ঘ) কোয়েল ডিম সালাদের সাথে মিশে খাওয়া যাবে ।

কোয়েল পাখির মাংসের উপকারীতা ( Benefits of Quail meat) —

কোয়েল পাখির মাংসের নানা ধরনের উপকারী দিক রয়েছে ।যা মানব স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ।নিম্নে তা’ আলোচনা করা হলো –
১। চোখের দৃষ্টিশক্তির যত্নে ( Take care eye Vision)–

কোয়েল ডিমে প্রোটিন ছাড়াও কুসুমে লুথিইন (Luthein ) ও জিকসাটিন ( Zeaksantin ) আছে যা চোখের রেটিনাকে সুস্থ রাখে ।ঐ দু’ ধরনের উপাদান চোখকে ব্লু লাইট (Blue light) থেকে রক্ষা করে ।ব্লু লাইট চোখের উপর খারাপ প্রভাব বিস্তার করে ।এ ছাড়াও কোয়েল পাখির ডিম ও মাংস উভয়ের মধ্যে ভিটামিন এ (Vitamin A ) রয়েছে যা চোখকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে ।

২। ত্বক/স্কিনের যত্নে ( Take care on skin ) : —

কোয়েল মাংসে ভিটামিন এ,ভিটামিন বি ছাড়াও ভিটামিন ই রয়েছে ।ভিটামিন ই (Vitamin E ) ত্বককে সুস্থ রাখে ।

৩। হাড়/অস্থিকে শক্তিশালী করে ( Strengthen Bones) —

কোয়েল মাংসে ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম রয়েছে ।এ দু’ধরনের উপাদান হাড়কে মজবুত রাখতে সহায়তা করে ।কোয়েল মাংস হাড়ের সমস্যা বিশেষ করে অস্টিওপোরোসিস (Osteoporosis) হতে কিছুটা হলেও রক্ষা করে ।

এছাড়াও দেহের গঠন,রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি,হৃদপিন্ডকে সুস্থ রাখা,ব্রেইন কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা,রক্তের হিমোগ্লোবিনের বৃদ্ধি করা সহ ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে সতেজ রাখা ।

কোয়েল মাংস ভক্ষণে সতর্কতার ( Caution of Quail meat consumption) : —

কোয়েল মাংসের অনেক উপকারী দিক থাকলেও অতিরিক্ত কোয়েল মাংস ভক্ষণে খারাপ দিকও রয়েছে ।অতিরিক্ত কোয়েল মাংস ভক্ষণে কিডনিতে পাথর ( Kidney stones) হওয়ার ঝুঁকি থাকে ।

সবমিলিয়ে বলা যায়, কোয়েল পাখির ডিম ও মাংস উভয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ।তবে পরিমাণ মতো গ্রহণ করতে হবে ।তা’হলে কোন স্বাস্থ্য ঝুঁকির কোন সম্ভাবনা নেই ।তাই সব রকম দ্বিধা অতিক্রম করে কোয়েল পাখির ডিম ও মাংস উভয় নিঃসংকোচে চিত্তে গ্রহণ করি ।